কোলোরেক্টাল ক্যান্সার-Colorectal cancer
প্রাদুর্ভাব কেমন?
কোলোরেক্টাল ক্যান্সার পরিচিত একটি ক্যান্সারের নাম। তৃতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক ক্যান্সার আক্রান্ত ও মৃত্যুর কারণ এইটা। ৭২%, কোলনে এবং ২৮% রেক্টামে হয়ে থাকে। ২০২০ সালের হিসাব মতে এক বছরে ১৯৩১৫৯০ (১০%) জন আক্রান্ত হন এবং ৯৩৫১৭৩ (৯.৪ %) জন মৃত্যুবরন করেছেন কোলোরেক্টাল ক্যান্সারে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশ সঠিক হিসাব এখনও জানা যায়নি। পুরুষ ও নারীর মধ্যে আক্রান্তের অনুপাত কোলন ক্যান্সার ১:১.২ এবং রেক্টাম ক্যান্সার ১.৭:১ । ৯০ ভাগ আক্রান্ত মানুষের বয়স ৫০ বছরের উপরে। উন্নত আর্থসামাজিক অবস্থার মানুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। যেমন উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রোলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইত্যাদি মানুষের জীবনযাত্রার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত এই ক্যান্সার। আধুনিক সভ্যতার আবরণে এই ক্যান্সার অনেকাংশে বেড়ে গেছে।
ঝুঁকিসমূহ কী ?নির্দিষ্ট কোনো কারণ আজও জানা যায়নি। কিছু উচ্চ ঝুঁকির কারণে জানা গেছে।
পরিবেশগত: এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকার নিম্ন জীবনমানের মানুষগুলো যখন উচ্চ জীবনমান নিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে বসবাস করেন। কথাটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রও প্রযোজ্য। আগের পরিশ্রমসাধ্য কৃষিভিত্তিকি জীবিকা থেকে এখন মানুষ বসে কাজ করার জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাই বাংলাদেশেও এর প্রবণতা বাড়ছে।
ধূমপান ও মদ্যপান: খাবারের মধ্যে অতিরিক্ত মদ্যপান ঝুঁকি বাড়ায়।
খাদ্যাভ্যাস: খাবারের মধ্যে অতিরিক্ত চর্বি ও কোলেস্টেরল ঝুঁকি বাড়ায়। অপর পক্ষে খাদ্যশস্য, সবুজ তাজা শাক-সবজি প্রতিরোধ করে। এছাড়া ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন দুধ, ছোটো মাছ, ডিমের কুসুমের উপরি অংশ ইত্যাদি ঝুঁকি কমাতে সাহায্যে করে।
শারীরিক পরিশ্রম: নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ঝুঁকি কমাতে পারে প্রায় অর্ধেক। অপর দিকে অতিরিক্ত শারীরিক ওজন ও স্থুলতা ঝুঁকি বাড়ায়।
Inflammatory Bowel disease (IBD): Ulcerative Colitis- যাদের এই রোগ রয়েছে তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রথম দশকে ৩% , দ্বিতীয় দশকে ২০% ও তৃতীয় দশকে ৩০ %।
অ্যাডেনোমাটাস পলিপ: যাদের মধ্যে আছে তারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন।
Familial Adenomatous Polyposis (FAP): এইটা একটা জিনগত বৈশিষ্ট্যের ফলাফল। যাদের এ বৈশিষ্ট্য আছে। তাদের ৫০% , ১৬ বছরের মধ্যে এবং ৯৫% , ৩৫ বছরের FAP এ আক্রান্ত হন।
এভাবে যাদের FAP হয় তারা সবাই কোলোরেক্টাল ক্যান্সার আক্রান্ত হন ৩৪ থেকে ৪০ বছরের মধ্যেই। বাঁচতে হলে নিয়মিত স্ক্রিনিং করতে হবে এবং FAP শনাক্ত হলে এ সার্জারি বা ঔষধ খাবার মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়া যায়।
ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস: একই মানুষের একবার আক্রান্ত হলে দ্বিতীয়বার আক্রান্তের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এছাড়া রক্তসম্পর্কীয় মানুষ আক্রান্ত হলে নিজের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। পূর্বে
কিছু সার্জারি যেমন পিত্তথলি ও মুত্রনালীর কিছু আপারেশন ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
রেডিয়েশন: পূর্বে অন্য ক্যান্সারের কারণে রেকটামে রেডিয়েশন পেলে যেমন প্রোস্টেট ক্যান্সার, পরবর্তীতে এই ক্যান্সার হতে পারে।
>> উপসর্গ সমূহ কী ?
সাধারনত প্রাথমিক অবস্থায় কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে অথবা শুধুমাত্র পেট ফাঁপা, অস্বস্তি ও সামান্য পেট ব্যথা থাকতে পারে।
>> কোলন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে বাম পাশে টিউমার থাকলে-
০১. মলত্যাগের নিয়মিত অভ্যাসে পরিবর্তন কোনো সময় কোষ্ঠকাঠিন্য আবার কোন সময় ডায়রিয়া হতে পারে।
০২. পেট ব্যাথা হতে পারে।
০৩. বমিভাব ও বমি হওয়া।
০৪. পায়খানার রাস্তা দিয়ে রক্ত যাওয়া।
০৫. পেট ফুলে যাওয়া।
>> ডানপাশে টিউমার থাকলে:-
০১. বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো লক্ষণ থাকে না।
০২. মৃদু পেটব্যথা।
০৩. পেটের ডানপামে চাকা অনুভুত হওয়া ।
০৪. শরীরে রক্ত কমে যাওয়া, অতিরিক্ত শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্ত হয়ে যাওয়া ও ওজন কমে যাওয়া।
০৫. পায়খানার রাস্তা দিয়ে রক্ত পড়া।
>> রেক্টাল ক্যান্সারের ক্ষেত্রে:- সবসময় পায়খানা হবে হবে ভাব পায়খানা চেপে রাখতে না পারা। বারবার পায়খানা লাগা।
** পরীক্ষাসমূহ:- শনাক্তকরণের জন্য-
DRE( Digital Rectal Examination)
Barium Enema
Colonoscopy
Biopsy (C : guided/Colonoscopy guided)
FNAC
IHC
>> স্টেজিংয়ের জন্য-
C: Scan of Chest,
Abdomen & Pelvis
Endo rectal USG
MRI of Pelvic region
PE: C: Scan
Bone Scan
এছাড়া টিউমার মার্কার CEA, CA 19-9 ও অন্যান্য সাধারণ পরীক্ষাসমূহ।
>> চিকিৎসাসমূহ সার্জারি:-
*** কোলন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে:
Right & Left : Hemi Colectomy
Diversion ileostomy
Extended Hemi colectomy
*** রেক্টাম ক্যান্সারের ক্ষেত্রে:
Low Anterior Resection (LAR)
Abdominoperineal Resection (APR)
Diversion Colostomy
>> কেমোথেরাপি
>> টার্গেটেডথারাপি
>> ইমিউনোথেরাপি
রেডিও থেরাপি: শুধুমাত্র রেক্টাম ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
ফলাফল: চিকিৎসার মাধ্যমে ৫ বছর ভালো থাকার সম্ভাবনা।
কোলন ক্যান্সার:
সীমিত অবস্থায় -৯১ %
স্থানীয়ভাবে ছড়াল-৭৩ %
দুরবর্তী অংশে ছড়ালে- ১৩%
রেক্টাম ক্যান্সার:
সীমিত অবস্থায়- ৯০ %
স্থানীয়ভাবে ছড়ালে ৭৪ %
দূরবর্তী অংশে ছড়ালে- ১৮ %
>> প্রতিরোধের উপায় কী ?
১. ঝুকির কারণসমূহ এড়িয়ে চলতে হবে।
২. যারা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন: যেমন- FAP, Ulcerative Colitis তারা এবং ৫০ বছরের অধিক বয়সী মানুষ নিয়মিত ক্যান্সার স্ক্রিনিং করবেন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ডাক্তারের পরাপর্শ অনুযায়ী নিবেন।
>> স্ক্রিনিংয়ের নিয়সমূহ নিম্নরূপ স্ক্রিনিং:
আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির মতে সাধারণ ঝুঁকির মানুষের ক্ষেত্রে ৫০ বছর থেকে স্ক্রিনিং শুরু করতে হবে।
প্রতি বছর- Fecal Occul: Blood Test: (FOBT)
C: Colonography
Double Contras: Barium Emema.
Flexible Sigmoidoscopy
প্রতি ৫ বছর পর পর -
অস্বাভাবিক পাওয়া গেলে যেমন, পলিপ, যা, টিউমার Colonoscopy করে বায়োপসি নেয়া হয়।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ন রোগীর ক্ষেত্রে-
>>যাদের FAP রয়েছে তারা ১০-১২ বছর বয়স থেকে ে৩৫-৪০ বছর পর্যন্ত প্রতি বছর Colonoscopy পরীক্ষা করা।
>> যাদের HNPCC রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ২০-২৫ বছর বয়স থেকেই অথবা পরিবারে সর্বনিম্ন যে বয়সে আক্রান্ত হয়েছে তা থেকে ১০ বছর পূর্ব থেকেই স্ক্রিনিং শুরু করতে হবে।
>> যাদের IBD রয়েছে তারা ৮-১০ বছর বসয় থেকেই Colonoscopy এর মাধ্যমে স্ক্রিনিং করতে হবে।
ডা: মো: তৌছিকুর রহমান।
টিউমার ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ
এমবিবিএস,(শসোমেক), সিসিডি (বারডেম)
এম ডি, (অনকোলজি)
সহকারী অধ্যাাপক ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ
টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ, বগুড়া।
চেম্বার: ইবনে সিনা কনসালটেশন সেন্টার।
কানজগাড়ী, বগুড়া।

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন